সোমবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৭

ভালবাসার ঘর

আমি সবুজ। এখন বিকেলে ছাদে বসে আছি। ফ্রি টাইম তাই। হাতে মোবাইল তাই গেমস খেলছি। শুধু গেমস খেলে তো আর জীবন চলে না, সংসারও চালাতে হয়। তাই একটা জব করব। বউটা বোধ হয় নিচে অনেক কাজ করছে। যাই ওকে একটু হেল্প করি।
.
নিচে এসে দেখি কিয়ের কাজ,,, কিয়ের কি?? বউ আমার রান্না ঘরে বসে চকলেট খাচ্ছে। উফফফ বাবা, এই পাগলীটাকে নিয়ে আর পারলাম না। এগুলো দেখে আমি রুমে চলে গেলাম। রুমে গিয়ে ফ্যান ছেড়ে আবার রিমুট হাতে বসে পড়লাম টিভি দেখতে।
.
কতখন দেখার পর কোথা থেকে যেন শা করে এসে আমার কোলে বসে পড়লো।
- এটা কি হলো?
- কোনটা?
- আমার কোলে বসলে কেন?
- তাহলে কই বসবো?
- আর জায়গা নাই?
- আমার বরই তো আমার একমাত্র জায়গা।
- তাই বলে আমার কোলে এসে বসা লাগবো?
- বসবই। একশো বার বসবো। আমার বরের কোলে আমি বসবো।
- আমাকে এভাবে কতখন থাকতে হবে?
- যে পর্যন্ত আমি থাকবো।
- কতখন থাকবে তুমি?
- ৯টা বা ১০ পর্যন্ত।
- কিইইইইহ??
- আমি ঘুমাবো এখন।
- বালিশে যাও।
- না।
- তাইলে?
- তোমার কোলে বসে বুকে মাথা দিয়ে ঘুমাবো।
- হায় কপাল এগো পিরিত দেখলে মরতে ইচ্ছে করে।
- কি বললে তুমি ( কান্না সু্রে)
-এই না কিছু বলি নাই তো,,, আমি আবার মরব কেন?? আমি কি আমার পাগলী বউটাকে রেখে কোথাও যেতে পারি।
- উহুঁ উহুঁ উহুঁ ( বুকে মুখ গুজে কাঁদছে)
- এই আবার কি হলো?
- তুমি আগে কেন বললে ও কথা হ্যাঁ? আমাকে একটুও ভালোবাসো না তুমি।
- কে বলছে?
- তোমার কথায় বোঝা যায়।
- কেমন??
- তুমি আমাকে ভালবাসলে ও কথা কখনো বলতে না।
- আচ্ছা হইছে হইছে!!! এই দেখো কান ধরছি,,
- হবে না।
- তাইলে?
-শক্ত করে জড়িয়ে ধরো।
- পারবো না।
- কেন?
- লজ্জা করছে।
- আম্মুওওওও,, উহুঁ উহুঁ,,
- আবার কি হলো, কাঁদছো কেন?
- তুমি আমার বর হওয়ার যোগ্য না,,, আর আমাকে ভালবাসা তো দূরের কথা, তুমি আমাকে ঝামেলা মনে করো।
- জান এগুলো কি বলছো?
- তাইলে নিজের বউকে কেউ জড়িয়ে ধরতে লজ্জা পায়।
- না।
- তাইলে তুমি পাও কেন?
- জানি না তো।
- এখন ধরবে কি না।
- এইতো ধরছি।
.
জড়িয়ে ধরার কয়েক মিনিট পর,
- আলপনা,, এই আলপনা,, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি??
.
যাক পাগলীটা ঘুমায়ছে। উফফফ বাঁচলাম। কিন্তু আমার কোলেই তো ঘুমিয়ে পড়ছে। এখন সরিয়ে বালিশেও দিতে পারছি না,,, ঘুম ভেঙে গেলে আবার কান্না করবে।। আর বলবো তুমি আমাকে কেন সরাইছো?? তার বদলে ভালো, এখানেই থাক একটু সময়। পরে কোনো ছুতো দিয়ে সরিয়ে দেব।
.
এই পাগলী বউটার নামই হলো আলপনা। এখন কোলে ঘুমিয়ে আছে,, আমারও ভালো লাগছে। উষ্ণ নরম শরীরের ছোঁয়ায় গরমটা এখন একেবারেই লাগছে না। আর ফ্যানের বাতাসে ওর চুল গুলো উড়ছে। ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় একদম একটা মায়াবী অপ্সরীর মতো লাগছে।
.
আমাদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হয়। তবুও বিয়ের আগে চারমাস চুটিয়ে প্রেম করছি। ৬ মাসের মাথায় মেয়ে দেখতে গেলাম। মেয়ে দেখেই এই প্রথম হবু বউয়ের উপর ক্রাশ খাইলাম। আগে কোনো মেয়ের উপর খাইনি। কিন্তু বউয়ের উপর খাব ভাবিনি।
.
আমি যখন বললাম মেয়ে আমার পছন্দ হইছে,, তখনই সবাই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে বসে পড়লো। তখনই আমি বললাম আমার অফিসে একটু ঝামেলা আর বাড়তি কাজ আছে, তাই কয়েক মাস পরেই বিয়ে হবে।
সবাই ভেবে নিয়ে আমার কথায়ই মত দিল।
.
তারপর থেকেই আমাদের দুজনের শুরু হয় প্রেম। প্রতিদিন দিনরাত সমানে আমাদের ফোনে কথা। আর প্রতি সপ্তাহে দুজনে লুকিয়ে দেখা করা। ঘুরতে যাওয়া। ফুচকা খাওয়া, দুজনে হাত ধরে হাটা এগুলোই হলো আমাদের প্রেমের প্রথম পাতার কাব্য।
.
প্রথম প্রথম ও আমার হাত ধরে হাটতে একটু লজ্জা পেতো কিন্তু তারপর ওর স্বভাব পাল্টে যায়। জোর করেই ও আমার হাত ধরতো আর যদি আমি ছাড়িয়ে নিতাম তাহলে তো হয়েই গেল।
আমাকে অনেক মারতো, কিল ঘুসি তো আছেই,, মারার পর আবার নিজেই কান্না করতো। তারপর সারাদিন আর কথা বলতো না, রাগ করে চলে আসতো। কিন্তু তার পরের দিন সকালে ফোন করে বলতো,,, সরি বাবু আর এমন হবে না, আর মারবো না, প্লিজ আজকে দেখা করো,।
.
আমি ওর এসব কান্ড দেখে না এসে পারতাম না। নিজেই মারবে তারপর নিজেই সরি বলবে। তারপর যখন বিকেলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এসে পার্কে যেতাম ওর সাথে দেখা করতে তখন কাছে যাওয়া মাত্রই জড়িয়ে ধরতো আর বলতো,, রাগ করছো,,, বললাম তো আর এমন হবে না।
.
তখন তো আমি আরও জোরে জোরে হাসতাম। ও আমার এমন অবস্থা দেখে আমাকেই দৌড়াতো। আর যখন দৌড়াদৌড়ি শেষে দুজন ব্রেঞ্চে গিয়ে বসতাম,, তখন আমাকে অনেক গুলো মিষ্টি দিতো।
( আরে ভাউ এ মিষ্টি দোকানের মিষ্টি না,,, এটা দুধ ময়দার দিয়ে তৈরির না,,, এ মিষ্টি লিপ্সটিক দিয়ে তৈরি মিষ্টি, বুঝতে পারছেন :?)
.
তারপর আমাদের বিয়েটা হয়েই গেল। অফিসের জন্য বাড়ি ছাড়তে হয়। ট্রান্সফার হওয়ার জন্য বউ নিয়ে বাসায় থাকি। বিয়ে করে তো আর বউ ছাড়া থাকা যায় না। তাছাড়াও আরও কাজ আছে যেগুলো আমি করতে পারি না। কাপড়চোপড় ধোঁয়া, আরও কত কি!!!
.
আসার সময় বউ রেখে একাই আসছিলাম। কিন্তু মা বাবা আমার দুঃখ বুঝতে পারছিল,,, বউ ছাড়া একটু ছেলের একা থাকা যে কতটা কষ্টের তারা ঠিক বুঝে ছিলো,,, একদম শিকড় ছাড়া কচুগাছের মতো)
তাই ওনারা আমি বউটাকে না রেখে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়।
.
আমি তখন এত্তো এত্তো এত্তো খুশি হয়ে ছিলাম যে,,, খুশিতে বউ রেখে শ্বাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরছিলাম।
পরে বুঝলাম এটা আমার বউ না বউয়ের আম্মু,, লজ্জায় একটা দৌড় যে দিছিলাম,, সেই দৌড়ে বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে গেছিলাম।
.
তারপর আর দুদিন বাড়ি যাইনি লজ্জায়,, যখন শ্বাশুড়ী চলে গেল তখন গেছিলাম।
যখন বাড়ি গেলাম তখন বউ আমার হাসতে হাসতে বাড়ি মাথায় তুললো। আর বললো, খুশিতে তখন কোনটা কি মনে ছিলো না নাকি?
.
ধ্যাত বউও লজ্জা দেওয়া শুরু করছে। তারপর আর শ্বশুর বাড়ি যাই নাই, বউ নিয়ে বাসায় চলে আসি।
.
তারপর থেকেই আমাদের দুজনের সংসার শুরু হয়। খুব ভালো আমার লক্ষী বউটা। খুব ভালবাসে আমাকে, আর আমিও এত্তো গুলো ভালবাসি। তাই আমাদের এই ছোট্ট সংসারে ভালবাসার কোনো অভাব নেই। আমাদের ঘর খুব খুশি আর আমিও খুশি এই পাগলী বউ পেয়ে।
.
কথায় আছে না ( কিছু কিছু পাগলীর জায়গা পাবনায় হয় না,, পাগলের বুকেও হয়) তেমনি আমার পাগলীটা আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
.
বসে বসে টিভি দেখায় আবার মন দিলাম। একটু পর একটা ব্যথা অনুভব করলাম,, দেখি আমার বুকে চিমটি দিচ্ছে। এইরে ঘুম থেকে জেগে গেছে এখন যে আবার কি করবে!!!
.
- এই শুনো না,
- কি?
- যাব।
- কই?
- ছাদে।
- যাও।
- তুমি নিয়ে যাও।
- কি করে?
- কোলে নাও।
- পারবো না।
- আবার কান্না করবো কিন্তু।
- না থাক, চলো।
.
হায়রে হায় কপাল,, আমার ঘরই তো একটা পাগলাগারদ হইয়া গেছে। আমার বউ তো আমার ভালবাসার পাগল কিন্তু ও আমারে সত্যিকারের মানসিক পাগল বানাইয়া ছাড়বো। কবে যে এই পাগলামি গুলো মাথা থেকে যাইবো কে জানে??
.
তারপর কোলে করে ছাদে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিলাম। তারপর দুজনে মিলে ছাদের এক পাশে দাড়িয়ে রইলাম। আবার পাগলামী করছে,,
আমার হাতের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কাদে মাথা রেখে দাড়িয়ে আছে। খুব ভালো লাগছে,,
.
ডুবন্ত গোধূলির আলোয় দুই ভালবাসার দুটি পাখি দাড়িয়ে আছে ওই রক্তিম সূর্যের পানে তাকিয়ে,, সীমাহীন ভালবাসায় যে দুইটি নরনারীর মিল এক বিকেলের সূর্যাস্তের নীরব আলোয় মূখরীত ভালবাসার প্রতিক। সারাজীবন রয়ে যাক এমন ভালবাসার প্রদীপের শিখা।
.
- এই শুনছো?
- হুম,
- আমার অনেক গুলো চুরি চাই।
- অনেক গুলো চুরি দিয়ে কি করবে?
- আমি পড়বো। আর কিছু রেখে দিব।
- আচ্ছা, কাল পেয়ে যাবে।
- সব ধরনের রংয়ের চুরি কিন্তু।
- জো আজ্ঞা
- ধ্যাত। আর কাল ঘুরতে নিয়ে যাবে।
- হুম।
- হুম কি?
- ঘুরতে নিয়ে যাব।
- উমমমমা।
- উমমমমা ২।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন